Breaking News

গাজীপুর চৌরাস্তা যাওয়া মানে জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাওয়া!

একদিকে ধুলার রাজত্ব। অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে গাড়িতে আটকা। এর নেই কোন সময়সীমা। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় যেমন যানজট, গভীর রাতেও তেমনই। এমনকি নিস্তার নেই ফজরের আজানের সময়ও। দিবারাত্রি চব্বিশ ঘণ্টাই যানজট আর ধুলাবালির কঠিন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে এয়ারপোর্ট যাতায়াতকারী যাত্রীদের। এই পরিস্থিতি সাময়িক নয়। গত ৮ বছর ধরে এমনই সীমাহীন ভোগান্তিতে রয়েছেন এ রুটের যাত্রীরা। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প এলাকায় এমন দুর্দশার চিত্র চোখে পড়ছে ৮ বছর ধরে। চার বছরের সময়সীমা পেরিয়ে আট বছর চলছে। তারপরও কাজ শেষ হওয়ার লক্ষণ নেই। গত বছরের শুরুতে বিআরটি কর্তৃপক্ষ দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেছিলেন, বছরের শেষ ভাগ অর্থাৎ ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই বিআরটি প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে।

ডিসেম্বর যাবার পর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে আবার বলা হচ্ছে, একই কথা অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বরেই শেষ করা যাবে। গত চার বছর ধরেই এভাবে ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। বার বার আশ্বাসে মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। প্রতিবাদে ওই এলাকার পরিবহন ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের ডাক দেন। গাজীপুরের সালনা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ধীরগতির উন্নয়ন কর্মকা-ের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ নিরসনে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণের দাবিতে ময়মনসিংহ বিভাগে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডাকে পরিবহন মোটর মালিক সমিতি। পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, ধীরগতির উন্নয়ন কর্মকা-ের কারণে গাজীপুরের সালনা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পরিবহন চলাচলে এক রকম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুরে মাত্র এক ঘণ্টায় পৌঁছানো গেলেও মহাখালী পর্যন্ত যেতে সময় লেগে যাচ্ছে ৪-৫ ঘণ্টা। এ অবস্থা নিরসনের দাবিতেই তারা এ ধর্মঘট ডাকেন। পরে সমস্যা সমাধানের আশ্বাসে তা প্রত্যাহার করে নেন তারা।

এভাবে আর কত আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে হবে সেটারও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না প্রকল্প পরিচালক। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন বার বার প্রকল্পের সময়সীমা অতিক্রম করে গেলেও কাজ শেষ হয় না। কৌতূহলী এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, এটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প। ঢাকা ও গাজীপুর এলাকার যানজট কমাতে ২০১২ সালে একনেক সভায় অনুমোদন পায়- গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট-বিআরটি-গাজীপুর-এয়ারপোর্ট। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি আশপাশের এলাকা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতকে স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে নেয়া হয় বিআরটি প্রকল্প। এতে মানুষের মনে স্বস্তি ফিরেছিল- রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের সময় অর্ধেকেরও কমে আসার বাস্তবমুখী পদক্ষেপে।

গাজীপুর থেকে বিশ মিনিটে এয়ারপোর্ট আসার লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পটি এখন মানুষের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। এখন আধা ঘণ্টার এই পথটুকু পাড়ি দিতে সময় লাগছে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। প্রকল্পটি আজ মানুষের ভোগান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সমন্বয়হীনতা, বার বার নকশা বদল, নতুন নতুন অবকাঠামো যোগ আর ঠিকাদারের গাফিলতির দরুন প্রকল্পের এহেন পরিণতি। চার বছর মেয়াদী এই প্রকল্প ৮ বছরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। সবশেষ বাড়ানো মেয়াদ অনুযায়ী এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২২ সালে। তবে এ বছরও যে কাজ শেষ হবে না তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রসমূহ। এ প্রকল্পে জনভোগান্তি এতটাই চরমে উঠেছে যে প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশ বিমানবন্দর থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি লাইন নির্মাণ প্রকল্প থেকেই সরে এসেছে সরকার।

ধূলিময় ভোগান্তি সকাল থেকে সন্ধ্যা, রাত থেকে ভোর। সব সময়েই চোখে পড়ে প্রকল্প এলাকায় ধুলাবালির রাজত্ব। যানবাহনের সার্বক্ষণিক চলাচলে ধুলাবালি থেকে মুক্তি মিলে না। গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যে কোন সময় সেখানে গেলেই দেখা যায় ধুলার দাপটে সবাই দিশেহারা। আব্দুল্লাহপুর থেকে হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত ধুলা আচ্ছন্ন অসহনীয় পরিবেশের শিকার হতে হয় সবাইকে। আবার বেশিরভাগ জায়গা ভাঙ্গাচোরা, খানাখন্দে ভরা- যা অসহনীয় যন্ত্রণাদায়ক।

হাসনা বানু নামের একজন চাকরিজীবী বলেন, প্রতিদিন যাওয়া আসা মিলিয়ে ৫-৬ ঘণ্টা লেগে যায়। এত ধুলা বালি যে শুধু গায়ের ড্রেস না, অনেক সমস্যা হয়- যেমন শ্বাসকষ্ট। সামান্য বৃষ্টি হলেই মনে হয় নদী পার হচ্ছি। যানজটের যে অবস্থা হয় তা অবর্ণনীয়। আসলে- গাজীপুর চৌরাস্তা যাওয়া মানে জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাওয়া একই কথা।

দীর্ঘ আট বছর ধরে চলছে এই অবস্থা। এয়ারপোর্টে চাকরিজীবী মাসুদা বলেন, প্রতিদিন যাওয়া আসায় অনেক কষ্ট হচ্ছে। ফুটপাথেও হাঁটা যায় না। দূষণ যেভাবে হচ্ছে জায়াগায় জায়গায় গর্ত। কোন বিকল্প নেই। দেখা যাচ্ছে ৫/১০ মিনিটের রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে। আর এ দুঃসহ ভোগান্তির কারণে একদিকে যানজটের ভোগান্তি অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা। আছে পরিবেশ দূষণ।

এর প্রতিকার কি জানতে চাইলে সড়ক ও সেতু বিভাগের একজন প্রকৌশলী বলেন, সাধারণত এই ধরনের মেগা প্রকল্পের জন্য যাতে পরিবেশ দূষণ প্রতিকার করা যায় সেজন্য আলাদা ব্যয়ের বাজেট রাখা হয় প্রকল্পে। প্রতিদিন কাজ শুরুর আগে পানি ছিটাতে হয়। সন্ধ্যায় পানি ছিটাতে হয়। এজন্য ব্যয়ের খাতে ধরাই থাকে বিশেষ বরাদ্দ। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে পানি ছিটানো হয় না। বেশি লাভের আশায় ঠিকাদাররা এ টাকা আত্মসাত করেন। যা দেখারও কেউ নেই। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব এগুলো দেখভাল করার।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রকল্পে অনেক ডিটেইলিং থাকে যখন টার্মস অব রেফারেন্স তৈরি করা হয়। যেখানে লেখা থাকে যে জনদুর্ভোগ কমাতে হবে। বিকল্প রাস্তা তৈরি করতে হবে। নির্মাণ সামগ্রী সুরক্ষিত রাখা এবং ক্ষেত্র বিশেষে ঢেকে রাখতে হবে। কিন্তু কোনটাই করা হচ্ছে না বিআরটিতে। প্রকল্প এলাকায় বায়ুদূষণ, ধূলিদূষণ, বৃষ্টির সময় কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ দেখে না। কেউ কিছু বলে না। ফলে এর সুযোগ নিয়ে ঠিকাদাররা বারবার উদাসীনতা দেখাচ্ছেন বলেই জনদুর্ভোগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।

সড়ক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিআরটি প্রকল্পের দরুন যে ভয়াবহ জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছে তার প্রতিকারে আইনের কোন প্রয়োগের নজিরও দেখা যায় না। প্রকল্পের সঙ্গে যারা জড়িত- তাদের দেখভাল করার সক্ষমতা নেই। ফলে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সেই আগ্রহ নেই। আইনে জনদুর্ভোগের জন্য যাদের পেনাল্টি হওয়ার কথা সেটি না হওয়ার কারণেই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কটি ব্যস্ত করিডর। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে এই করিডরের মাধ্যমে ২১টি জেলা শহর যুক্ত রয়েছে। ২০১৪ সালের সার্ভে অনুযায়ী প্রতিদিন উভয় দিকে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার থেকে ৪৪ হাজার যা ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজারে। গাজীপুর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার আলাদা বাস লাইন নির্মাণ করে ২০১৬ সালে ওই সড়কে বাস নামানোর কথা ছিল। সেটি ব্যর্থ হওয়ায় নতুন করে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে- ২০২২ সাল। এ প্রকল্পটির বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত সড়কের প্রশস্ততা ১৮০ থেকে ১৯০ ফুট। অন্যদিকে গাজীপুর অংশের কোথাও কোথাও সড়কের প্রশস্ততা ৬০ থেকে ৬৫ ফুট। বিআরটি প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এই সড়কটি সরু হয়ে যায়। সড়কের মাঝ বরাবর পিলার বসানোয় ব্যস্ততম এই সড়কের প্রশস্ততা অর্ধেক হয়ে গেছে। যানবাহন ও পথাচারীদের চলাচলের জন্য যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তাতেও কোথাও কোথাও নির্মাণ সামগ্রী রাখা হয়েছে। দীর্ঘদন এই সড়ক সংস্কারও করা হয় না, ফলে সড়কের কিছু কিছু স্থান ভাঙ্গাচোরা, খানাখন্দে ভরা। এই পথের যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে বিআরটি প্রকল্প।

গত বছর জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছিলেন, প্রকল্প পরিচালক ইলিয়াস শাহ। জনকণ্ঠকে তিনি বলেছিলেন, অনেক বাধা পেরিয়ে এখন এমন এক স্থানে পৌঁছেছি যেখান থেকে সুখবর দেয়া যায়। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে টার্গেট বেঁধে দেয়া হয়েছে প্রকল্পটি শেষ করার। যদি কোন কারণে সেটা নাও হয়- তাহলেও বড় জোর ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। এটুকুই নিশ্চয়তা দিতে পারি আগামী বছরের ডিসেম্বরের পর আর অভিযোগ থাকবে না। এই রাস্তার সুফল পাবেন দেশবাসী।

ইলিয়াস শাহের মুখে এমন আশ্বাসের বাস্তবতা মিলেনি গত ডিসেম্বরে। গত সপ্তাহে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের মহাসড়কের গোলচত্বরে চার বছর ধরে সাজিয়ে রাখা আছে গার্ডার। দাঁড়িয়ে আছে পিলার। নিচে বালুর স্তূপ, কংক্রিট ও পাথর। ধীরলয়ে একটা দুটি গাড়ি সিঙ্গেল লেনে চলছে। সারাক্ষণই লেগে থাকছে যানজট। ঘটছে দুর্ঘটনা। ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের এমন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যানবাহনের জন্য দুর্ভোগ হয়ে আছে। শুধু বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট নির্মাণের জন্য এমন সঙ্কট নয়। বিমানবন্দর এলাকা আরও কয়েকটি প্রকল্পের সংযোগস্থল। প্রথম দফায় প্রকল্প নির্মাণের সময়সীমা ধরা হয়েছিল তিন বছর। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায়ই দেখা দিয়েছে বিপত্তি। এর পর উত্তরা এলাকায় সড়কে কয়েকটি ইউলুফ থাকার কারণে যানজটের তেমন ভোগান্তি নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছর দুয়েক আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল প্রকল্পটি। নানা জটিলতায় শুরু থেকে এ পর্যন্ত চার বার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। গাজীপুর থেকে ২০ মিনিটে এয়ারপোর্ট আসার স্বপ্নের এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয় ২০১৩ সালে। তখন থেকেই শুরু হয় রাস্তা কাটাকাটি ও খোঁড়াখুঁড়ি। শুরু হয় ভোগান্তি। প্রথম দিকে বৃহত্তর স্বার্থে সাময়িক ভোগান্তি যাত্রীরা মেনে নিলেও এক পর্যায়ে শুরু হয় ক্ষোভের বহির্প্রকাশ। জয়দেবপুর থেকে সায়েদাবাদ চলাচলকারী গাজীপুর পরিবহনের চালক শামীম বলেন, কয়েক বছর ধরেই ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে গেছি। কবে এই কষ্টের শেষ হবে আল্লাহই জানেন।

এদিকে জানা গেছে, প্রকল্পটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত। গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত অংশের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী ইলিয়াস শাহ। মাঝখানে আব্দুল্লাহপুর থেকে চেরাগআলী পর্যন্ত চার কিলোমিটার ব্রিজের অংশটুকুর প্রকল্প পরিচালক হচ্ছেন প্রকৌশলী লিয়াকত আলী। তিনি গত জুনে বলেছিলেন, নানা কারণে জটিলতা ছিল। এখন সব জটিলতা কেটে গেছে। ২০২২ সালের জুনের মধ্যেই শেষ করা যাবে। তবে কিছু অংশ যেমন আমার অধীনস্ত হাউসবিল্ডিং থেকে চেরাগআলী চার কিলোমিটার আগামী এপ্রিলের মধ্যেই শেষ করে যাতায়াতযোগ্য করা যাবে। এ ছাড়া গড়পড়তা সব অংশেরই প্রায় ৬০ ভাগেরও বেশি পাইলিং শেষ হয়ে গেছে। কঠিন জটিল ও সময় সাপেক্ষের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন শুধু স্প্যান ও গার্ডার বসানোর কাজ চলছে দ্রুত গতিতে।

বাকি অংশের পরিচালক ইলিয়াস শাহ জানান, গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত সবটাই হবে চার লেনের রাস্তা। পাশে থাকবে পৃথক পৃথক আরও দুটি সার্ভিস লেন। এর মাঝখানে শুধু আব্দুল্লাহপুর থেকে চেরাগআলী পর্যন্ত থাকবে চার কিলোমিটার ফ্লাইওভার। যা অনেকটাই এগিয়ে আছে। এ ছাড়া গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ছোট ছোট ৭টি ফ্লাইওভার থাকবে। এগুলো হচ্ছে গাজীপুর চৌরাস্তা, ভোগড়া, টঙ্গী, বাইপাস, জসীমউদদীন ও এয়ারপোর্ট। বর্তমানে এই ফ্লাইওভারগুলোর কাজই চলছে। রাস্তার কাজ প্রায় শেষের পর্যায়ে। বলতে পারেন গোটা প্রকল্পের ৭০ শতাংশেরও বেশি কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে চীনের ঠিকাদারি কোম্পানি জেটিইজি সঠিক সময়ে কাজই শুরু করতে পারেনি। প্রকল্প এলাকায় বিশালাকৃতি ক্রেন, ড্রেজার, ডিগারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি আনতেই দীর্ঘ সময় লেগেছে। তারপর পাইলিং করতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গ্যাস লাইন কেটে যাওয়া সংক্রান্ত একাধিক দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য জটিলতায় বার বার সময় পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ বিমানবন্দর পয়েন্টে প্রধান ক্রেনটি ভেঙ্গে পড়ায় আরও বেকায়দায় পড়তে হয়েছে। এছাড়াও ঠিকাদারি কোম্পানির অর্থ ছাড়ের দীর্ঘসূত্রতাও অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

আলোচিত প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদিত হয় ২০১৮ সালের নবেম্বর মাসে। সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের অধীনে মোট ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার বিআরটি লেন বাস্তবায়নে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত। এর মধ্যে ১৬ কিলোমিটার এ্যাট গ্রেড সড়ক নির্মাণের দায়িত্বে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, সাড়ে ৪ কিলোমিটার এলিভেটেড অংশ নির্মাণের দায়িত্বে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং বাস ডিপো। সংযোগ সডক ও হাটবাজার নির্মাণের দায়িত্বে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমইসি ইন্টারন্যাল প্রাইভেট লিমিটেড ২০১৫ সালে এলিভেটেড অংশের ডিজাইন সম্পন্ন করার পর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জিংসু প্রভিনশিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ লিমিটেডকে ২০১৭ সালের অক্টোবরে নিয়োগ দেয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার এলিভেটেড অংশে এবং ৮টি র‌্যাম্পে মোট ১৬৩টি স্প্যান রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যে ৭৮টি স্প্যানে আই গর্ভার এবং ৮৫টি স্প্যান বক্স গার্ডার নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পের নক্সা ছিল বক্স গার্ডারের মাধ্যমে উড়াল সেতু নির্মাণ। এখন নক্সা পরিবর্তন করা হয়েছে। এলিভেটেড অংশের নির্মাণ কার্যক্রমে বক্স গার্ডারের পরিবর্তে আই গার্ডার পদ্ধতি অনুসরণের প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ অংশের মধ্যে উত্তরা হাউসবিল্ডিং থেকে টঙ্গী চেরাগআলী মার্কেট পর্যন্ত ৬ লেন বিশিষ্ট এলিভেটেড সেতু নির্মাণ করা হবে। এই অংশে ছয়টি এলিভেটেড স্টেশন, ১০ লেন বিশিষ্ট টঙ্গী সেতুও নির্মাণ করা হবে। এদিকে সর্বশেষ গত সপ্তাহে এ সড়কে ভোগান্তির প্রতিবাদে পরিবহন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগের গণপরিবহন। এতে বেশ ভোগান্তিতে পড়েন ঢাকাগামী যাত্রীরা। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তারা তা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে নির্দিষ্ট সময়ে কাজের অগ্রগতি না দেখলে, যানজট কমানোর ব্যবস্থা না নিলে, ধুলাবালি নিরসণের উদ্যোগ না নিলে আবারও তারা ধর্মঘটের কর্মসূচী দেবেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সভাপতি আমিনুল হক শামীম ও ময়মনসিংহ জেলা পরিবহন মোটর মালিক সমিতির মহাসচিব মাহবুবুর রহমান।

About admin

Check Also

এবার এক রাতেই কোটিপতি মাছ বিক্রেতা

মাছ বিক্রি করে এক রাতেই কোটিপতি হয়ে গেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক মৎস্য ব্যবসায়ী। সামুদ্রিক মাছ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *